MBN24 :
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের—বিশেষ করে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও বিভাগীয় কমিশনারদের—প্রেস ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সাংবাদিক সমাজের একটি বড় অংশ মনে করছে, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই ধরনের নেতৃত্ব সাংবাদিক সংগঠনের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা যদি একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনের সভাপতি হন, তাহলে এটি স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) তৈরি করে। এ ধরনের অবস্থায় সাংবাদিকরা মুক্তভাবে সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন না। ফলে গণমাধ্যমের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা সরাসরি প্রভাবিত হয়।
আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুসারে:
- সরকারি কর্মকর্তাদের তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
- এমন কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, যেখানে সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেস ক্লাবের সভাপতি বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য এই বিধিমালার নীতির লঙ্ঘন বা সংখ্যালঘু অবৈধতার সুযোগ তৈরি হয়।
সংবিধান ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের প্রভাবাধীন প্রেস ক্লাব এই স্বাধীনতার উপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে। এতে সাংবাদিকরা সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশে ঝুঁকি অনুভব করতে পারে, যা গণমাধ্যমের নৈতিকতা ও জনগণের তথ্যাধিকারকে হুমকির মুখে ফেলবে।
বাস্তব চিত্র ও সাংবাদিকদের উদ্বেগ
জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের অনেক প্রেস ক্লাবের সভাপতির পদে সরকারি কর্মকর্তাদের দেখা গেছে। সাংবাদিকরা অভিযোগ করছেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সভাপতি থাকলে সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। প্রেস ক্লাবের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা কমে যায়। সাংবাদিক সংগঠনের নীতি ও স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একজন সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, “প্রেস ক্লাব সাংবাদিকদের সংগঠন—এখানে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যদি সভাপতির পদে থাকা থাকে, তবে স্বাভাবিকভাবে সাংবাদিকরা মুক্তভাবে কাজ করতে পারবে না।”
ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তাবনা
সাংবাদিক সমাজ থেকে এই ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য বেশ কয়েকটি সুপারিশ এসেছে:
★ প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও অন্যান্য নেতৃত্বের পদে শুধুমাত্র পেশাদার সাংবাদিকদের রাখা।
★সরকারি কর্মকর্তাদের সভাপতির পদে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা
★কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা, যা স্বার্থের সংঘাত এড়াতে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।★ সরকারি কর্মকর্তারা চাইলে উপদেষ্টা বা সম্মানিত অতিথি হিসেবে থাকতে পারেন, তবে নেতৃত্বে নয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। এটি জনগণের তথ্যাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য অপরিহার্য। তাই প্রেস ক্লাবসহ সকল সাংবাদিক সংগঠনকে প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রাখা সময়ের দাবি। অন্যথায়, গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সাংবাদিকতার নৈতিক মানসিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সাংবাদিক সমাজের এ সতর্ক বার্তা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে ভূমিকা রাখবে।
প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের সংগঠন, সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের পদে বা দায়িত্বশীল করা মানে শাসনের কাছে মাথা বিক্রি করে দেওয়া। আমরা লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেসক্লাব গুলোতে ক্রিটিক্যাল পরিস্থিতি তৈরি করে কৌশলে প্রশ্নের লোকজন দায়িত্ব গ্রহণ করে সমাধানে দীর্ঘসুত্রিতা তৈরি করে। এতে গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের দুর্বল মনোবল দুর্বল করে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফর। এ বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়কে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা জারি করার জন্যও তিনি আহ্বান জানান।