নিজস্ব সংবাদদাতা :
ময়মনসিংহে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়কে ঘিরে ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেট এবং সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কার্যালয়ের মোটরযান পরিদর্শক জহির উদ্দিন বাবর। তার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দেওয়া, সাধারণ গ্রাহকদের অকারণে হয়রানি এবং দালালনির্ভর সেবা ব্যবস্থা পরিচালনার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কার্যালয়কে ঘিরে ১০ থেকে ১৫ সদস্যের একটি সক্রিয় দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের বাইরে থেকে নিয়ম অনুযায়ী সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি সেবাকেন্দ্রটি কার্যত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, কোনো যানবাহনের মালিক বা সেবাপ্রার্থী সরাসরি আবেদন করলে বিভিন্ন অজুহাতে তাকে হয়রানির মুখে পড়তে হয়। কখনও সামান্য ত্রুটি, আবার কখনও অভিযোগ অনুযায়ী অযৌক্তিক কারণ দেখিয়ে আবেদনপত্র ফেরত দেওয়া হয়। তবে একই আবেদনকারী যদি অভিযুক্ত কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত দালালদের মাধ্যমে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করেন, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই ফিটনেস সনদসহ প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, দালালের সহযোগিতা ছাড়া বিআরটিএ কার্যালয়ে কোনো ফাইল কার্যকরভাবে অগ্রসর হয় না।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার কার্যালয়ে বহিরাগত দালালদের অবাধ যাতায়াত রয়েছে। তারা সরকারি নথি, সংবেদনশীল ফাইল এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত থাকা সত্ত্বেও বহিরাগতদের পরিদর্শকের টেবিল, ড্রয়ার এবং বিভিন্ন নথিপত্র ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি দপ্তরের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ময়মনসিংহ বিআরটিএ কার্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই জহির উদ্দিন বাবরের বিরুদ্ধে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে আসছে। পরিবহন মালিক ও সেবাপ্রার্থীদের একাংশের দাবি, ঘুষ ছাড়া প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এর আগেও তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের নানা অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি অভিযোগগুলো যাচাইয়ে কার্যকর তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগও দেখা যায়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএর এক কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগের পরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও তার ঘনিষ্ঠদের মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ফলে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা হবে না—এমন ধারণা থেকেই তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোটরযান পরিদর্শক জহির উদ্দিন বাবর তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “আমি সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করছি। দালাল চক্রের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সরকারি ফাইল বহিরাগতদের স্পর্শ করারও কোনো সুযোগ নেই।”
বিআরটিএর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সেবাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এমন অভিযোগ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সড়ক নিরাপত্তা এবং সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও পরিবহন মালিকদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তে দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক।