MBN24 :
হযরত খাজা মঈনুদ্দিন হাসান চিশতি (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশে চিশতিয়া সুফি তরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ সাধকদের একজন। তাঁর আগমন ভারতের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। আজমের শরিফকে কেন্দ্র করে তিনি যে মানবপ্রেম, সেবা ও উদারতার দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত।
খাজা সাহেবের খানকাহ ছিল নিছক কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়; তা ছিল মানবতার আশ্রয়স্থল। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা—কোনো পার্থক্য সেখানে মানা হতো না। দরিদ্র, মুসাফির, অসহায়, বিধবা, অনাথ—সবার জন্য তাঁর দরবার ছিল সর্বদা উন্মুক্ত। কথিত আছে, তাঁর খানকাহে কখনো চুলা নিভে যেত না; লঙ্গরখানা দিন-রাত চালু থাকত।
ঘটনাটির পটভূমি
একদিন আজমের শরিফে, তাঁর দরবারে এক অতি বৃদ্ধ ভিক্ষুক উপস্থিত হন। দীর্ঘ পথ চলায় তিনি ক্লান্ত, ক্ষুধায় কাতর। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বললেন—
> “হে আল্লাহর ওলি, আমি খুব ক্ষুধার্ত।”
এই একটি বাক্যই খাজা মঈনুদ্দিন (রহ.)–এর হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করল। তিনি কোনো প্রশ্ন করলেন না, কোনো যাচাই করলেন না—কারণ তাঁর দৃষ্টিতে ক্ষুধার্ত মানেই আল্লাহর বান্দা, আর আল্লাহর বান্দার সেবাই ছিল তাঁর ইবাদত।
সেদিন তাঁর নিজের জন্য সংরক্ষিত ছিল সামান্য কিছু খাদ্য—দিনের শেষ খাবার। তিনি এক মুহূর্তও দেরি না করে সেই সম্পূর্ণ খাবার বৃদ্ধ ভিক্ষুকের হাতে তুলে দিলেন। নিজে কিছুই রাখলেন না। সেদিন তিনি না খেয়েই রাত পার করলেন—উপবাসে।
নূরানি আহ্বান
রাত গভীর হলে খাজা সাহেব ইবাদতে মগ্ন হন। নফল নামাজ, জিকির ও ধ্যানে ডুবে থাকা অবস্থায় তিনি অন্তরে এক বিশেষ নূরানি আহ্বান অনুভব করেন—যা ছিল কোনো সাধারণ কণ্ঠ নয়, বরং এক গভীর আত্মিক অনুপ্রেরণা। সেই কণ্ঠে বলা হয়—
> “হে মঈনুদ্দিন,
তুমি আমার বান্দাদের দুঃখ লাঘব করছো।
তুমি ক্ষুধার্তকে খাওয়ালে, অসহায়কে আশ্রয় দিলে।
আজ থেকে তোমার উপাধি হলো—
‘গরিবে নওয়াজ’
অর্থাৎ, গরিবদের উপকারক।”
এই আহ্বান ছিল তাঁর জীবনের এক মহান আত্মিক স্বীকৃতি। এটি বোঝায়—আল্লাহর কাছে ইবাদতের সর্বোচ্চ রূপ হলো মানুষের দুঃখ লাঘব করা।
‘গরিবে নওয়াজ’—একটি দর্শন
এই ঘটনার পর থেকেই খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) ‘খাজা গরিবে নওয়াজ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু এটি কেবল একটি উপাধি নয়—এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন।
যেখানে সেবাই সাধনা
মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ইবাদত
ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো নামাজেরই সম্প্রসারণ
ভালোবাসাই দাওয়াত
তিনি নিজেই বলতেন—
> “আল্লাহর পথে সেই-ই অগ্রসর,
যার হৃদয়ে সৃষ্টির প্রতি করুণা আছে।”
আজমের শরিফ: মানবতার মিলনকেন্দ্র
আজও আজমের শরিফে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ উপস্থিত হয়—কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু, কেউ শিখ, কেউ খ্রিস্টান। সবাই এক নামেই তাঁকে ডাকে—খাজা গরিবে নওয়াজ। কারণ তাঁর দরবার মানুষকে ধর্মের চেয়ে মানবতার কথা শেখায়।
—
উপসংহার
খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)–এর এই ঘটনা আমাদের শেখায়— আধ্যাত্মিকতা আকাশে নয়, মানুষের হৃদয়ে।
আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া যায় ক্ষুধার্তকে খাইয়ে, অসহায়কে জড়িয়ে ধরে।
এই কারণেই তিনি কেবল একজন সুফি নন—
তিনি মানবতার দরবারের বাদশাহ,
তিনি গরিবদের বন্ধু—গরিবে নওয়াজ।
